পাঠক ডঃ আলী বলেছেনঃ কালপুরুষদা স্মরণে এই পোস্ট দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনার বিষয়েও এ সুযোগে কিছু জানা হল । নব আলোকে বাংলা -এর মত ম্যাগাজিন সম্পাদনা সে যে বিষম দুরূহ কাজ তা আমি বুঝি, কেননা কলেজে পাঠকালে নির্বাচিত ছাত্র সংসদের ম্যগাজিন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছিল বলে ।
আপনার পোস্টের লিংক ফলো করে কবি( সামু ব্লগের গর্বিত ব্লগার) কালপুরুষ রচিত মুল্যবান কবিতা “আমার রক্তের ইতিহাস “ মন্ত্রমুগ্ধের মত পাঠ করে এসেছি । শুধু এসেছি নয় কবিতাটিকেও সযতনে বুকে করে নিয়ে এসেছি এখানে।
আগে কবিতাটির বিষয়ে কিছু কথা,কবিতাটির মাত্র কয়েকটি চরণ তুলে ধরে বলে নিই । তারপর নীচে কালপুরুষের মুল্যবান কবিতাটির পুরাটাই এখানে দিব তুলে।
কবি কালপুরুষ -এর আমার রক্তের ইতিহাস এই কবিতা শুধু একটি রচনা নয়; এটি যেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এর রক্তাক্ত ইতিহাসের এক হৃদয়বিদারক প্রতিধ্বনি।মাত্র কিছুদিন আগে তাঁর মহাপ্রয়াণ এই কবিতাকে আরও গভীর বেদনার আবরণে ঢেকে দিয়েছে। নিচে কবিতার প্রতিটি ভাব ও কতক আবেগঘন দৃশ্যের রেশ ধরে কিছু কথা তুলে ধরা হলো:-
১. “মাগো, একটু হাসো-- দেখি তোমায় দুচোখ ভরে” এ যেন অন্ধকারের ভেতর মায়ের মুখ।
কবিতার শুরুতেই এক মৃত্যুপথ যাত্রী মুক্তিযোদ্ধার আকুল আহ্বান মায়ের হাসি দেখার জন্য। চারপাশে যুদ্ধের অন্ধকার, আকাশে চাঁদ নেই, প্রকৃতি যেন থমকে গেছে। এই অন্ধকার শুধু রাতের নয়; এটি দখলদারিত্বের, অত্যাচারের, অনিশ্চয়তার অন্ধকার। আহত মুক্তিযোদ্ধা তার রক্তে ভেজা শরীর লুকাতে চায় মায়ের আঁচলে যেন মায়ের স্নেহই শেষ আশ্রয়। সেই রক্তই আগামীকালের পতাকার লাল রং হয়ে উঠবে এই ভাবনাই তাকে মৃত্যুর মুখেও গর্বিত করে তোলে।
২. মাগো, একটু আদর করো--বুকটা কেমন খা খা করে ওঠে। এ যেন মায়ের ত্যাগ ও সন্তানের বিদায়ের করুণ সুর।
এখানে ফুটে ওঠে এক নিঃসঙ্গ সংসারের গল্প। বাবা নেই, মা-ই ছিলেন একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হলে সন্তানের রক্তে জেগে ওঠে দেশের ডাক। মায়ের বুক ভেঙে দিয়ে সে চলে যায় যুদ্ধে। এখন ফিরে এসেছে কিন্তু বিজয়ের পাশে, মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা যেন মায়ের নীরব কান্নার প্রতিধ্বনি,পাতা নড়ে না, বাতাস থেমে যায়, পেঁচার ডাক যেন অশুভ সংকেত হয়ে বাজে।
৩. “মাগো, একটু গান করো আজ শুনি” এ যেন যুদ্ধের নীরবতা ও মৃত্যুর পূর্বাভাস।
যুদ্ধের ভয়াবহতা এখানে এক গভীর নিস্তব্ধতার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। গুলির শব্দে রাতের শান্তি ছিন্নভিন্ন হয়েছে, পাখিরা উড়ে গেছে, ভোরের গান থেমে গেছে। জোনাকির আলো যেন অদ্ভুতভাবে জ্বলে ওঠে ,যেন মৃত্যুর আগে প্রকৃতি নিজেই এক অদ্ভুত আলোকসজ্জা করছে। আহত যোদ্ধার মনে প্রশ্ন এ কি শ্মশানের নিকটবর্তীতা? তার চিতা কি শিগগিরই জ্বলবে?
৪. “মাগো, কাঁদছো কেন বলো--- খোকা তোমার এসেছে আজ ফিরে” এ যে শহীদের গর্ব।
এখানে বেদনার মধ্যেও এক অদম্য গর্ব ফুটে উঠেছে। সন্তানের মৃত্যু, মায়ের কোলে এ যেন এক অনন্য সম্মান। একটি গুলি তার বুক ভেদ করলেও সে বিশ্বাস করে স্বাধীনতার ফসল একদিন ফলবেই। শত্রুরা যতই শক্তিশালী হোক, সাত কোটির মানুষের ঐক্য তাদের পরাজিত করবে। মাতৃভাষা, স্বাধীনতা ও মানুষের মর্যাদা সবকিছুই একদিন রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হবে।
৫. “মাগো, আর যে সময় নেই--- ঘুম যে আসে জলোচ্ছ্বাসের মতো” এ যেন একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগের শেষ মুহূর্ত।
শেষ অংশে মৃত্যুর মুহূর্ত এসে দাঁড়ায়। ক্লান্ত শরীর ঘুমের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু তার মনে একটাই আকাঙ্ক্ষা -মায়ের আঁচল যেন হয়ে ওঠে স্বাধীনতার পতাকা। সে চায় সবাই যেন জানে, এই পতাকার লাল রং তার মতো অসংখ্য শহীদের রক্তে আঁকা। নিজের মৃত্যুকে সে পরাজয় মনে করে না; বরং এটিকে দেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার অধিকার হিসেবে।
এই কবিতায় মা ও সন্তানের সম্পর্কের ভেতর দিয়ে আসলে পুরো জাতির ইতিহাস কথা বলে। মায়ের আঁচল এখানে মাতৃভূমির প্রতীক, আর সন্তানের রক্ত স্বাধীনতার মূল্য। কবি কালপুরুষ যেন স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়; এটি অসংখ্য মায়ের কান্না, অসংখ্য সন্তানের আত্মত্যাগ, আর এক অমর ইতিহাসের ফল।
কবির মৃত্যুর পর এই কবিতাটি যেন আরও গভীরভাবে প্রতিধ্বনিত হয় । যেন তিনি নিজেই সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কণ্ঠে বলে যাচ্ছেন স্বাধীনতার পতাকার লাল রং কখনোই ভুলে যেও না এটি রক্তে লেখা ইতিহাস।
কবি কালপুরুষ এই কবিতার মাধ্যমে যেন স্মরণ করিয়ে দেন স্বাধীনতার ইতিহাস শুধু রাজনীতি নয়; এটি মায়ের কান্না, সন্তানের রক্ত, আর এক জাতির আত্মমর্যাদার গল্প।
আমাদের সামু ব্লগের গর্ব এই কবি কালপুরুষের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলী ।কবি কালপুরুষ রচিত 'আমার রক্তের ইতিহাস' সকলের পাঠের সুবিধার জন্য এখানে তুলে দিলাম ।
মাগো, একটু হাসো-
দেখি তোমায় দুচোখ ভরে।
বেহায় এই অন্ধকার আজ যাচ্ছে না কেন সরে,
চাঁদটা কেন ওঠেনি আজ জেগে,
আকাশ কেন অন্ধকারে ঢাকে?
রক্তে ভেজা শরীর আমার ঢাকবো ক্যামন করে?
বুকে আমায় চেপে ধরো মাগো,
রক্তে রাঙাই শারীর আঁচল জমাট বাঁধার আগে।
পতাকা আমার কেমন হলো লাল, দেখবে সবাই ওড়াবে যখন কাল।
বলতে পারো মাগো, এতো মেঘ কেন আজ আকাশ জুড়ে?
তুমি হাসোনি বলে কি তাই!
বুকটা কেমন খা খা করে ওঠে।
বাবাতো সেই কবেই গেছে চলে,
আগলে তুমি রেখেছিলে অনেক কষ্ট সয়ে।
পারলে না তাও- পালিয়ে গেলাম, যুদ্ধ যেদিন শুরু;
বলেছিলাম আসব ফিরে, এলাম তোমার কাছে।
বাতাস কেন বহেনা আজ জোড়ে?
উফ্! অলুক্ষণে পেঁচাটা কেন ডাকে?
হাসি কেন দেখিনা তোমার ঠোঁটে?
রাতভর কেঁদেছো বলে কি তাই!
কানদুটো কেমন অসাড় হয়ে আছে।
নিঃশব্দের প্রহর কেটে গুলি যখন ছোটে,
ঝাঁঝড়া হলো নিঝুম ঘুমের রাত;
উড়াল দিল পাখীরা সব মেঘে।
চাঁদটা কেন ঢাকলো গোপন বেশে?
থামলো কেন ভোরের পাখীর গান?
শশ্মানটা কি ধারে কাছে কোথাও?
চিতা আমার জ্বলবে বলে কি তাই!
মাগো, কাঁদছো কেন বলো-
ভাগ্য আমার এতই ভাল ছিল,
শহীদ হব আপন মায়ের কোলে।
বিঁধলো না হয় একটা গুলি বুকে,
স্বাধীনতার ফলবে ফসল দেখো-
কতই আর ঝড়াবে ওরা রক্ত এক এক করে!
আমি, তুমি আমরা সবাই সাত কোটিতো কম নই!
পারবে কি আর শেয়াল-শকুন, হায়েনার দল জোট বেঁধে?
নিত্যনতুন ফলবে ফসল আমারি ক্ষেত জুড়ে,
বলবে কথা মায়ের ভাষায় সবাই একই স্বরে।
জানবে সেদিন আমার কথা,
রক্তে রাঙ্গা বীর শহীদদের করুণ মৃত্যু গাঁথা।
খাবলে নেবে ওরা।
নেংটি ইঁদুর শত্রু সবার যাবেই এদেশ ছেড়ে।
শুধু তুমি চাইবে বলে তাই!
মাগো, আর যে সময় নেই-
ঘুম যে আসে জলোচ্ছাসের মতো,
যেতেই হবে এবার আমি জানি;
পাহাড়সম কষ্ট তোমায় দিলাম হাতে তুলে।
মৃত্যু আমার রইলো জমা আমার মায়ের নামে।
বলবো কথা সবাইকে আজ সময় হাতে নেই-
মৃত্যু আমার এক জনমের বাঁচার অধিকার,
পতাকা হয়ে উড়লো নাহয় তোমার শাড়ীর আঁচল।
একটু শুধু খেয়াল রেখো সবাই যেন দেখতে পায়,
স্বাধীনতার সেই পতাকা আমি এঁকেছি রক্ত দিয়ে,
তোমার ছেলে শহীদ হলো তাই।
দাদার লেখাগুলো আছে।
এই কবিতাটি যেদিন আমার চোখে পড়লো, আমার যে কেমন লেগেছিল বুঝাতে পারবো না। লেখাটি শুধু যে অনন্য একটি লেখা তা নয়, বাংলা কবিতার রাজ্যে এ যেন একটি অসাধারণ সৃষ্টি, অনন্য এক কাব্যিক শিল্পকর্ম। তখন শিল্পী এম এস জুলহাস তার স্কেচ, পোস্ট দিতেন। তার স্কেচের সাথে দাদার কবিতা সমন্বয় করে এবং আরো সকলের লেখা নিয়ে সংখ্যাটি যখন প্রকাশ করেছিলাম, একটা অনাবিল আনন্দে আমার মন ভরে গিয়েছিল। দাদার কবিতার সাথে যথার্থ স্কেচ যেন অতর্কিতেই কেউ হাজির করে দিয়েছিল।
দাদার আরো অনেক গুণ ছিল। উনি একজন ফটোগ্রাফার ছিলেন। ভাল রান্না জানতেন। অ্যাস্ট্রলজির একটা বই হাতে নিয়ে পুরনো একটা ছবি পোস্ট দিয়েছিলেন। [সেই বইটা আবার আমারও ছিল, anyway] আর অ্যাস্ট্রনমি না জানলে তো কালপুরুষ ID সিলেক্ট করতেন না।
বহুগুণের এই মানুষকে আমাদের চলার পথে পেয়ে আমরা খুশী । আমরা গর্বিত । এবং আমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।
যেখানেই থাকুন, যে ডাইমেনশানেই থাকুন, দাদা যেন ভাল থাকেন।
পাঠক বলেছেনঃ উনি ব্লগ ছেড়ে দেওয়ার পরে আমি ব্লগে এসেছিলাম তবে তার অনেক লেখা আমি পড়েছি পড়ে। সামু ব্লগের বলতে গেলে খুব কম মানুষের সাথেই বাস্তবে দেখা হয়েছে। সবাইকে চেনা কেবল তার লেখার মাধ্যমেই কিন্তু তারপরেও যখনই শুনি ব্লগের কেউ আর নেই তখন মনের ভেতরে একটা মন খারাপের ভাব চলে আসে। দীর্ঘ সময়ে সেই মন খারাপের ভাবটা থাকে।ছেড়েছেনও এক যুগের উপরে, এরকম সুপার একজন একটিভ ব্লগারের বিদায়ে সেই সময় যেমন কষ্ট পেয়েছিলাম, এখনও পৃথিবীর মোহ-মায়া ত্যাগের খবরেও কষ্ট পেলাম।
১৩ ই মার্চ ২০২৬, সকাল ১০:৪৬০
রাজীব নুর বলেছেনঃ বুঝতে পারছি, আপনার মন খারাপ হয়েছে। একজন ব্লগারের মৃত্যুতেও আমারও মন খারাপ হয়েছে।একদিন আমিও মারা যাবো।
***
আমার মন্তব্যঃ আর কিছুদিনের মধ্যে এমন টেকনলোজি আসবে যে মানুষ তার দেহের কোষের ক্ষয় রোধ করতে পারবে।
মানুষ অমর হবে। আমরা সে সুযোগ অল্পের জন্য পাবো না। কিন্তু আপনারা পাবেন।
১৩ই মার্চ ২০২৬
শায়মা বলেছেন: কালপুরুষ ভাইয়া আমার কাছে যে কত প্রিয় ছিলো তা আমার অনেক পুরোনো লেখাতেই পাওয়া যাবে। ভাইয়ার গুনাবলী গুনতেও সময় লেগে যাবে। ভাইয়া অনেক অনেক সৌখিন ও ট্যালেন্ট একজন মানুষ ছিলেন। খুব কষ্ট পেয়েছি ভাইয়া আর এই পৃথিবীতে নেই জানতে পেয়ে।***
আমার মন্তব্যঃ আমাদের চলার পথে তার মতো মানুষের সাথে যে পরিচিত হতে পেরেছি এটাই আমাদের সৌভাগ্য।







No comments:
Post a Comment