Mar 28, 2026

ভাষার চিন্তা ভাবনা

বিশ্ব পাঠ - আবু সিদ

I.পড়ার সাধারণ অর্থঃ

সাধারণভাবে, পড়া বা Reading হলো লিখিত বর্ণ বা চিহ্ন দেখে তার অর্থ উদ্ধার করার উপায়। পড়া কেবল শব্দ উচ্চারণ নয়, বরং লেখার বিষয়বস্তুর সাথে নিজের চিন্তার যোগ ঘটানো। গফ এবং টানমার (The Simple View of Reading, ১৯৮৬)-এর মতে, পড়া মূলত দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করেঃ

• ডিকোডিং (Decoding): অক্ষর এবং শব্দ চেনা ।

• ভাষার বোধগম্যতা (Language Comprehension) : সেই শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে পারা।

অর্থাৎ, যদি কেউ শব্দ পড়তে পারে কিন্তু অর্থ না বোঝে, তবে তা প্রকৃত 'পড়া' নয় ।

পড়ার পাঁচটি স্তম্ভ (National Reading Panel, ২০০০)

গবেষকদের মতে, সফলভাবে পড়ার জন্য ৫টি দক্ষতা প্রয়োজনঃ

  • ধ্বনি চেনা (Phonemic Awareness) : কথার ভেতরের ছোট ছোট শব্দ বা ধ্বনি আলাদা করতে পারা।
  • ধ্বনি ও বর্ণের মিল (Phonics ) : কোন বর্ণের উচ্চারণ কেমন হবে তা জানা।
  • সাবলীলতা (Fluency) : নির্ভুলভাবে এবং দ্রুততার সাথে পড়া।
  • শব্দভাণ্ডার (Vocabulary): শব্দের অর্থ জানা।
  • বোধগম্যতা (Comprehension): যা পড়া হচ্ছে তার মূল ভাব বুঝতে পারা। 
পড়াকে অনেকে অনেকভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। যেমন, "পড়া মানে হলো ডানা মেলে ওড়া। আমরা যখন কোনো বই পড়ি, তখন আমরা অন্য কোনো মানুষ হয়ে যেতে পারি, অথবা অন্য কারো চোখ দিয়ে পুরো পৃথিবীকে নতুন করে দেখতে পারি।" [১]

II. পড়ার সার্বজনীন অর্থ (Universal meaning of reading)
পড়া শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের চারপাশে থাকা অনেক কিছু আমরা ‘পড়তে পারি। যেমন, বইয়ের লেখা, প্রকৃতির বিভিন্ন দৃশ্য, মানুষের আচরণ কিংবা কোনো ছবি। কোনো কিছু পড়ার মাধ্যমে আমরা তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্য বুঝতে পারি।
সার্বজনীন পড়ার সহজ ধারণাঃ
সাধারণভাবে বলতে গেলে, কোনো কিছুর দিকে তাকিয়ে সেটা নিয়ে চিন্তা করা এবং তার অর্থ বের করাই হলো পড়া। এটি তিনটি সহজ ধাপে ঘটে :
  • দেখা ও চেনা: প্রথমে কোনো চিহ্ন (যেমন: একটি শব্দ, আকাশের মেঘ বা কারো হাসি) চোখে দেখে চেনা।
  • পূর্ব-জ্ঞানের সাথে মিলিয়ে নেয়া: সেই চিহ্নটি দেখে মনে মনে কোনো পরিচিত বিষয়ের সাথে মিলিয়ে দেখা।
  • বুঝতে পারা: সবকিছু মিলিয়ে সেই জিনিসটির আসল মানে বা অর্থ খুঁজে বের করা।

ধরা যাক, বাইরে বের হব, কিন্তু জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশে কালো মেঘ। এখানে পড়া হচ্ছে:

১. দেখা ও চেনা (Perception) : জানালার বাইরে আকাশের বড় কালো মেঘ। এটি হলো পড়ার প্রথম ধাপ: চিহ্নটিকে চেনা।

২. মিলিয়ে দেখা (Translation): মনে পড়ল যে, আগে যখনই এমন কালো মেঘ দেখেছি, তখনই বৃষ্টি হয়েছে। মেঘের সাথে বৃষ্টির ধারণাটি মনে মনে মিলিয়ে নেয়া হলো পড়ার দ্বিতীয় ধাপ।

৩. বুঝতে পারা (Interpretation): "এখন বাইরে গেলে ভিজে যাওয়ার ভয় আছে, তাই ছাতা নিতে হবে অথবা এখন যাওয়া যাবে না।" এই যে মেঘ দেখে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া, এটা হলো পড়ার তৃতীয় ধাপ।

একইভাবে, কারও হাসি মুখ দেখে 'পড়তে' পারা যে সে খুশি। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি দেখে 'পড়তে পারো যে এখন থামা উচিত। এভাবে, আমরা বইয়ের বাইরের জগতকে প্রতিনিয়ত পড়ি!

সার্বজনীন পড়ার সংজ্ঞা

সার্বজনীন 'পড়া' ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেকে অনেক সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন। সেসব সংজ্ঞার একটা এরকম: “পড়া মানে শুধু বইয়ের অক্ষর দেখে শব্দ উচ্চারণ করা নয়। পড়া হলো আমাদের চারপাশের জগতকে চেনার একটা উপায়। আমরা যখন কোনো কিছু পড়ি, তখন আসলে আমরা আমাদের চারপাশটা কেমন, তা বুঝতে পারি। সহজ কথায়, পড়া মানে হলো চারপাশের সবকিছু বুঝে নিয়ে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা।" [২]

III. 'বিশ্ব পাঠ' বা পৃথিবীকে ‘পড়া' (Reading the World)

সাধারণ অর্থে, 'বিশ্ব পাঠ' বলতে কেবল মুদ্রিত অক্ষর পড়া বোঝায় না; বরং আমাদের চারপাশের বিভিন্ন 'সংকেত' (Signs), প্রকৃতি ও তার নিয়ম-কানুন এবং মানুষ ও তার জীবনব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা। এটি এমন একটি দক্ষতা, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি কোনো বিশেষ পরিস্থিতি, মহাজাগতিক নিয়মাবলী, সামাজিক কাঠামো বা পারস্পরিক কথোপকথনের গভীর অর্থ উদ্ধার করতে পারেন। অর্থাৎ, আমাদের চরপাশের আকাশ, রাস্তাঘাট, মানুষের কথা বলা এ সবকিছু আমরা ‘পড়তে পারি।

আমরা ৪টি সহজ ধাপে এটি করতে পারিঃ

চারপাশের ধরন চেনা (Identifying Patterns): আমরা যখন খেয়াল করি কেন আমাদের শহরের রাস্তাগুলো এভাবে তৈরি করা হয়েছে, কিংবা দোকানে কেন খেলনাগুলো এক জায়গায় সাজানো থাকে—তখন আমরা পৃথিবীকে পড়তে শিখি। এমনকি একটা বিজ্ঞাপন দেখে আমাদের কেন সেটা কিনতে ইচ্ছে করছে, সেই কারণটা বুঝতে পারাও এক ধরণের পড়া।
পেছনের গল্প বোঝা (Contextual Awareness): আমরা বুঝি যে কোনো ঘটনাই এমনি এমনি ঘটে না। তার পেছনে থাকে মহাজাগতিক নিয়ম-কানুন, পুরনো কোনো ইতিহাস বা আমাদের সমাজের নানা নিয়ম । যেমন, কেন আমরা বিশে দিনে বিশেষ পোশাক পরি, তার পেছনের কারণটা বুঝতে পারা।
প্রশ্ন করতে শেখা (Critical Thinking) : আমরা কোনো কিছু দেখে সরাসরি বিশ্বাস করি না। আমরা মনে মনে প্রশ্ন করি, ‘এটা এমন কেন?” বা ‘এতে কার লাভ?” ইত্যাদি।
সামাজিক প্রেক্ষাপট (Social Literacy): এমন অনেক নিয়ম আছে যা কোনো বইয়ে লেখা থাকে না, কিন্তু আমরা বড়দের বা বন্ধুদের দেখে শিখে নিই। যেমন, কার সাথে কীভাবে সুন্দর করে কথা বলতে হয় বা অন্য কারো মন খারাপ থাকলে সেটা তার মুখ দেখেই বুঝে ফেলা।
প্রাকৃতিক প্রেক্ষাপট (Natural Literacy): এটি হলো প্রকৃতির নিয়ম ও সংকেতগুলোকে বুঝে নেওয়ার ক্ষমতা। যেমন আমরা অনেক কিছু বই পড়ে নয়, বরং চারপাশ দেখে শিখি। আকাশে কালো মেঘ জমলে বুঝি বৃষ্টি আসতে পারে, গরমে গাছের পাতা শুকিয়ে গেলে বুঝি পানি কম আছে, কিংবা ভোরে পাখির ডাক শুনে বুঝি সকাল হয়ে গেছে। এগুলো হলো প্রকৃতির দেওয়া সংকেত, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে। এটি আমাদের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে এবং জীবনের নানা পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। সহজ কথায় বলতে গেলে, আমাদের চারপাশের আকাশ, নদী, পাহাড়, স্কুল, খেলার মাঠ, এমনকি টিভি বা ইন্টারনেটের ভিডিওগুলোও একেকটা ‘বইয়ের মতো। আমরা শুধু তাকিয়ে থাকি না, বরং মন দিয়ে খেয়াল করে বোঝার চেষ্টা করি আসলে সেখানে কী ঘটছে।
IV. বিশ্ব পাঠের কতিপয় ধারণা ( Some dimensions of reading the world)
‘পৃথিবীকে পড়া’ বা বিশ্ব পাঠের ধারণাটি প্রথম পাওয়া যায় পাওলো ফ্রেইরের (১৯৭০) বইয়ে। তার মতে, সাক্ষরতা শুধু শব্দ চিনে নেয়া নয়; বরং এটি সামাজিক বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা। ফ্রেইরে বলেন যে শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু ““শব্দ” নয়, বরং “পৃথিবী”ও পড়তে পারে। এর মাধ্যমে সাক্ষরতা হয়ে ওঠে মানব মনন ও চেতনা বিকাশের উপায়।
ফ্রেইরে মূলত আমাদের সমাজ এবং অধিকার নিয়ে সচেতন হওয়ার কথা বলেছেন। তবে ‘বিশ্ব পাঠা বা পৃথিবীকে পড়ার এই ধারণাটি আরও বড়। এর মাধ্যমে আমরা আমাদের প্রাকৃতিক জগতকে জানতে পারি এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করতে পারি। প্রকৃতিকে যদি আমরা একটি ‘বই’ হিসেবে দেখি, তবে এর চারপাশের পরিবেশ এবং নানা ঘটনাগুলো হবে একেকটি ‘গল্প' বা ‘পাঠ’। পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা যখন এই চিহ্নগুলো বুঝতে শিখি, তখন মহাবিশ্ব সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান আরও গভীর হয়।
বিশ্ব পাঠ সম্পর্কিত কিছু ধারণা নিচে আলোচনা করা হলো।
a) শব্দ চেনার বাইরে: সমালোচনামূলক সাক্ষরতা
প্রচলিত সাক্ষরতা মডেল যেমন Simple View of Reading ( Gough & Tunmer, 1986 ) মূলত শব্দ চেনা ও ভাষাগত বোঝার ওপর জোর দেয়। কিন্তু Paige, Rupley, এবং Ziglari (2024) বলেন, বোঝার প্রক্রিয়ায় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা যুক্ত করতে হবে, যাতে কেবল উপরিভাগের অর্থে সীমাবদ্ধ না থাকে। পৃথিবীকে পড়া মানে হলো লেখা নিয়ে প্রশ্ন করা, লুকানো ধারণা বের করা এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যায়ন করা। যেমন, অভিবাসন নিয়ে গণমাধ্যমের বর্ণনা বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু শব্দ বোঝা যথেষ্ট নয়; বরং দেখতে হবে কার কণ্ঠ জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে আর কার কণ্ঠস্বর চেপে রাখা হয়েছে।
b) ন্যায় ও অংশগ্রহণ
Guerreiro, Barker, এবং Johnson (2022) আমাদের মনে করিয়ে দেন যে সাক্ষরতা মূল্যায়নে ন্যায় ও অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিতে হবে। পৃথিবীকে পড়া মানে হলো বোঝা যে সামাজিক বৈষম্য কীভাবে জ্ঞান অর্জন ও উপস্থাপনায় প্রভাব ফেলে। একজন সমালোচনামূলক পাঠক শুধু তথ্য গ্রহণ করেন না; বরং তিনি তা বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করেন এবং প্রশ্ন করেন—লেখা কীভাবে প্রভাবশালী মতাদর্শকে শক্তিশালী করে বা চ্যালেঞ্জ জানায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি Gay (2018) - এর culturally responsive pedagogy-এর সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অর্থ তৈরির কেন্দ্রে থাকতে হবে।
c) প্রকৃতিকে পড়া এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া 
প্রকৃতিকে পড়া মানে প্রকৃতির সংকেতগুলো বোঝা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া। যেমন, হিমবাহ গলে যাওয়া আমাদের সঙ্কেত দেয় যে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে এবং এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নদী ও মহাসাগরে বর্জ্যের স্রোত দেখে আমরা বুঝি, মানবসৃষ্ট দূষণ প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঝুঁকির মুখে। এই ঘটনাগুলোকে প্রকৃতির দেয়া সতর্কবার্তা বা সংকেত। এই সংকেতগুলো বুঝে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াটা হলো বিশ্ব পাঠ।
d) সমালোচনামূলক পড়ার কৌশল
Sun এবং তাঁর সহকর্মীরা (2021 ) দেখিয়েছেন যে পড়ার কৌশলগুলো বোঝার ক্ষমতা বাড়ায়। পৃথিবীকে পড়তে হলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করা, সংযোগ তৈরি করা এবং বিভিন্ন তথ্য একত্রিত করার মতো কৌশল ব্যবহার করতে হবে। এসব কৌশল পড়াকে সক্রিয় প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত করে, যেখানে পাঠক বিভিন্ন লেখা ও প্রেক্ষাপট থেকে অর্থ নির্মাণ করে। যেমন, কোন বিষয়ে সরকারি নথি আর স্থানীয় সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা তুলনা করলে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারে কথার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কোথায়।
e) পড়া মানেই কাজ (Praxis)
ফ্রেইরে (1970) বলেন যে পৃথিবীকে পড়া কাজ থেকে আলাদা নয়। সমালোচনামূলক সাক্ষরতা কোনো বিমূর্ত অনুশীলন নয়; বরং এটি হলো praxis। অর্থাৎ, পৃথিবী নিয়ে চিন্তা করা এবং তার পরিবর্তনের জন্য কাজ করা। যখন শিক্ষার্থীরা কোন লেখা সমালোচনামূলকভাবে ব্যাখ্যা করে, তখন তারা সেটিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এবং বিকল্প কল্পনা করতে সক্ষম হয়। পৃথিবীকে পড়া তাই হয়ে ওঠে একটি যৌথ প্রয়াস, যা পারস্পরিক আলোচনা বা সংলাপ ও সামাজিক পরিবর্তনকে উৎসাহিত করে।
এই আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, বিশ্ব পাঠ মানে সাক্ষরতাকে কেবল শব্দ ও বাক্য পড়ে বোঝার দক্ষতা হিসেবে না দেখে, সমালোচনামূলক সচেতনতার পথে নিয়ে যাওয়া। এতে একজন পাঠকের প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ, কৌশল প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। ফ্রেইরে যেমন বলেন, শিক্ষা এমন হতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা পৃথিবীকে পড়তে পারে। তারা যেন নিছক তথ্যের নিস্ক্রিয় ভোক্তা না হয়ে পরিবর্তনের সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠে।

২৮শে মার্চ, ২০২৬

আমার মন্তব্যঃ  চৎকার ভাবনা। চিন্তার যে এত ধাপ আছে তা কখনো চিন্তায় আসে না।  

আমাদের মস্তিষ্ক যে ধাপে ধাপে এ কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারে আমাদের অজান্তে এটা বিরাট বিস্ময়। কোন একটা ধাপ বাদ গেলে কত বাধা এসে পড়ে জীবনে।

লেখাটি খুব ভাল লাগলো।

https://www.somewhereinblog.net/blog/Abu_Sid/30388665

২৮ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৪৯

হুমায়রা হারুন বলেছেন: ভাষা বিজ্ঞানের ওপর লেখা এই অনেকদিন পর এই প্রথম দেখলাম। খুব ভাল লাগলো। সেই আবু জর ভাইয়ের লেখার পর ভাষার ওপর আর কারো লেখা আমি পাই নি।
অনেক ধন্যবাদ।
+++++++
পোস্টের সারমর্ম হিসেবে যে মন্তব্যটি রাজীবকে করেছেন তা দিয়ে আরেকটি পোস্ট হয়ে যায়। প্রতিটি ব্যাখ্যা অসাধারণ। ভাষা বিজ্ঞানের ওপর আপনার রচিত কোন বই কি আছে?

২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৮:৫৩

লেখক বলেছেন: আপনার মতামতের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ভাষা বিজ্ঞানের ওপর আমার লেখা কোন বই নেই। কিন্তু, আমি এ বিষয়ে কিছু লেখাপড়া আর কাজ করছি। শেষ হলে এই ব্লগে পাবেন। আফসোসের ব্যাপার যে বাংলাদেশে প্রকাশনাটা আজও একটা মানসম্মত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। যাইহোক, রাজীবের মন্তব্যের উত্তর নিয়ে যেটা বলেছেন কিছুক্ষণ আগে আমি ঠিক একই কথা ভাবছিলাম। হয়ত আগামীকাল বা পরশু সেটা পোস্ট করব।

২৮ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৩৪

হুমায়রা হারুন বলেছেন: যা কাজ করেছেন তা ব্লগে দিলে আমরা খুব উপকৃত হবো।
খুবই তথ্য সমৃদ্ধ , মনোযোগ ধরে রাখে , ভাষাকে জানতে সাহায্য করে - আপনার এমন সব লেখা আমাদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
প্রকাশক এর দরকার নেই।
ব্লগেই দেবেন।
লেখা অনেক হয়ে গেলে ই-বুক করে ফেলবেন।

২৯ শে মার্চ, ২০২৬ সকাল ৯:১০

লেখক বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ।

২৯ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:১২

হুমায়রা হারুন বলেছেন: পোস্টের জন্য ধন্যবাদ।
অনেক বড় ক্লাশে পড়ার পর একটা শব্দের সাথে পরিচিত হলাম 'প্রশ্ন ব্যাংক'। ওখানে MCQ প্রশ্ন আর উত্তর দেয়া থাকবে। ওগুলো থেকে প্রশ্ন আসবেই আসবে। বই না পড়লেও চলবে।
তখন এই প্রথম দেশে 'MCQ' পদ্ধতি চালু হলো। আমরা এসব টার্ম আগে শুনি নাই। তারপর
ছেলেমেয়েরা বই পড়া বাদ দিয়ে প্রশ্ন ব্যাংক মুখস্থ করে বাংলায় যখন ৯০% মার্ক্স পাওয়া শুরু করলো তখন তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম। আমরা তো বাংলায় ৬০% কি সর্বোচ্চ ৬২% পেলে সেই ছাত্রকে দেখতে যেতাম। আর এখন বাংলায় , ইংরাজীতে ৮০% ছাড়িয়ে যাচ্ছে! কি সাংঘাতিক মেধার ছড়াছড়ি।
তারপর আসলো 'গোল্ডেন A'.
আর বুঝবার সাধ্যি আমার নাই।

৩০ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৮

রাজীব বলেছেনঃ[ লেখাপড়ার মধ্য আনন্দে আছে। এটা আমি এখন বুঝি। কিন্তু যখন লেখাপড়ার মধ্যে ছিলাম, তখন লেখাপড়া বিরক্ত লাগতো।
সবার ক্ষেত্রেই তাই। কারণ লেখা -পড়ার নামে 'পরীক্ষা' নামক একটা আতংক তখন চাপিয়ে দেয়া হতো।
 ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩০
লেখক বলেছেনঃ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক ও করুণ। এটা কেবল পাঠ্য বিষয় (সিলেবাস) বা শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণী বা নবম গ্রেডের বিষয় নয়। এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক বহুমুখী সঙ্কটে নিপতিত। গত ১২ বছরে আমার আরও কিছু সহকর্মীর সাথে আমি সারাদেশে শত শত স্কুল ভিজিট করেছি, এবং অজস্র ক্লাস পর্যবেক্ষণ করেছি। আমরা কাজ করেছি মূলত প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে। স্বভাবত, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরও আমাদের সাথে শরীক হয়েছেন অনেক সময়। এই অভিজ্ঞতাটুকুর আলোকে আমি যতটুকু বুঝতে পারি তা এরকমঃ
শিক্ষাব্যবস্থায় এই দুর্যোগ অনেকগুলো কারণে ঘটছে। এর প্রধান প্রধান কারণগুলো নিম্নরূপ -
১। পলিসির দুর্বলতাঃ শিক্ষা ব্যবস্থাটা এখনও কেরানী তৈরির উপযোগী যেটা ব্রিটিশের সময় ছিল। সৃজনশীল মানুষ তৈরির পরিকল্পনা সেখানে নেই। আবার, আমারা যদি চাই যে ক্লাস ৫-পাস শিশু সাবলীলভাবে বাংলা পড়তে ও লিখতে পারবে তাহলে মূল্যায়ন ব্যবস্থা তেমন হওয়া উচিত। স্কুলের পরীক্ষার যে পদ্ধতি সেখানে মুখস্তবিদ্যা যাচাই করা হয়। [এস এস সি তে সব থেকে ভালো করা শিক্ষার্থীদেরও যদি কোন বিষয়ে ১০ লাইন বাংলায় লিখতে দেয়া হয় তাহলে কয়জন সঠিক ভাবে লিখতে পারবে? অথবা কোন খবরের কাগজের একটা নিবন্ধ বা প্রবন্ধ পড়ে তাদের কয়জন বিশ্লেষণ বা সারমর্ম তৈরি করতে পারবে তা গবেষণার বিষয়।
২। প্রশাসনিক দুর্বলতাঃ বিষয়টা বলতে একটা উদাহরণ দেয়াই যথেষ্ট হবে। একবার, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক কাউকে না জানিয়ে স্কুল ভিজিটে গেলেন। দেখলেন যে সেখানে শিক্ষক নেই। একজন এস এস সি পাশ মেয়ে ক্লাস করাচ্ছে। পরিচালক মহোদয় শিক্ষককে ফোন দিয়ে বললেন, যে মেয়াটা আপনার ক্লাস করাচ্ছে ওর বেতন স্যামনের মাস থেকে ২ হাজার টাকা বাড়ায়ে দিয়েন, ও অনেক ভালো পড়ায়। শিক্ষক তো রেগে আগুন। তিনি বললেন, কে আপনি? পরিচালক মহোদয় বললেন, আপনি তো স্কুলে আসেন না। বাইরে ব্যবসা করেন। স্কুলে এসে দেখেন আমি কে?
৩। স্কুলের অব্যবস্থাপনাঃ ক্লাসে শিক্ষকরা কী পড়াচ্ছেন, কেমন পড়াচ্ছেন তা দেখার কেউ নেই। পর্যাপ্ত মনিটরিং ও মেন্টরিং নেই।
৪। শিক্ষাদান পদ্ধতিঃ ক্লাসে বা শ্রেণীকক্ষে ফলপ্রসূ শিক্ষাদান নেই। বেশিরভাগ সময় শিক্ষক/শিক্ষিকা একাই কথা বলে যান। শিশুরা শেখার বিষয়গুলো প্রাকটিস করতে পারে না।
৫। মানবসম্পদঃ শিক্ষক নিয়োগে ভীষণ সমস্যা। একবার এক স্কুলে গিয়ে দেখা গেল যে স্কুলের ক্লাস-৫ এর শিক্ষার্থীরা ক্লাস-৩ এর বাংলা বই পড়তে পারে না। উদ্বেগের ব্যাপার হলো যে এমন একজন শিক্ষককেও পাওয়া গেল, যিনিও ক্লাস-৩ এর বাংলা বই পড়তে পারেন না।
এক্ষেত্রে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশে অধিকাংশ চাকরি (বিশেষত, সরকারি চাকরি) যেন এক ধরনের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থা। একবার কোন মতে ঢুকতে পারলে ব্যাস, জীবন পার। নিজের স্কিল উন্নত করার দিকে আর কারও কোন মনযোগ নেই। 
একটা উদাহরন দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। আরেকবার আরেকজন সরকারি কর্মকর্তা স্কুল ভিজিটে গিয়ে দেখলেন যে দোতলা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৫০ এর মতো। অন্যদিকে, পাশের একটা বেড়ার স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। স্কুলটা কোন কিন্ডারগার্টেন নয়। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ ছেলে-মেয়ে স্কুলটা চালায়। শিক্ষার্থীরা যে যা পারে বেতন দেয়। যারা পড়ায় তারা হয়ত মাসে ৫/৭ বা ৮/১০ হাজার টাকা পায়। তাদের কোন পেনশন বা ভবিষ্যৎ নেই! অন্যদিকে, সরকারী প্রাইমারী স্কুলে শিক্ষক পাচ্ছেন প্রায় হাজার ৩০ - অন্য সুযোগ সুবিধা তো আছেই!
এগুলোর বাইরে কারিকুলাম বা সিলেবাস, এবং আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার আছে যেগুলো নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী কাজ করা প্রয়োজন। হয়ত আমাদের প্রয়োজন, ২০-২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘ ও কার্যকরী পরিকল্পনা, এবং সবার সহযোগিতা! আমার অভিজ্ঞতা যদিও প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্রিক, তবু যতটুকু বুঝতে পারি তাতে মনে হয় হাইস্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় বা কারিগরি স্কুলের অবস্থা এর থেকে বিশেষ উন্নত নয়। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিকল্পনা এবং অনেক অনেক কাজ করা প্রয়োজন।

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৫০
আমার মন্তব্যঃ আমাদের দেশে Education এর ওপর গবেষণার সুযোগ পেলে আমার ইচ্ছা ছিল 'প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষাদান' পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবো। সেই তিন দশক আগের কথা বলছি । তখন IER দেখে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম যে ভেবেছিলাম এখানে রিসার্চ সুপারভাইজার পেলে যদি কাজ করতে পারতাম। কিন্তু সে সুযোগ আসেনি। আপনি প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে মূলত কাজ করছেন জেনে আমার ইচ্ছার কথাটা আজ মনে পড়ে গেল।

০৩ রা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:০৪০
লেখক বলেছেনঃ হুমায়রা হারুন, আপনার ইচ্ছা শুনে অনেক ভালো লাগলো। আসলে বাংলাদেশে গবেষণার তেমন সুযোগ নেই। গবেষণার সহায়ক পরিবেশের খুব অভাব। কারণ, গবেষণার মুল উদ্দেশ্য হলো, সত্যের উদ্ঘাটন, জ্ঞানের মুক্তি । আমরা সত্য খুঁজতে ভয় পাই, যদি তা আমাদেরই বিপক্ষে যায়! আর জ্ঞানের বদলে কোথায় কীভাবে টাকা বানানো যাবে এই হলো সবার সাধারণ লক্ষ্য। যাই হোক, আপনার মতামতের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

No comments:

Post a Comment